করোনা সংকট মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাঃ
করোনা ভাইরাসের আক্রমনে সংকটাপন্ন মানুষকে দিক নির্দেশনা দিতে ২৩ মার্চ মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশটি নির্দেশনা দেন।
১. ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারন ছুটি থাকবে। তবে কাঁচাবাজার, খাবার, ওষুধের দোকান, হাসপাতাল এবং জরুরি যেসব সেবা আছে তার জন্য এগুলো প্রযোজ্য হবে না। করোনাভাইরাস বিস্তৃতির জন্য সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনসাধারণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ক্রয় ও চিকিৎসা গ্রহণ ইত্যাদি) কোনোভাবেই ঘরের বাইরে না আসার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
২. এ সময়ে যদি কোনো অফিস-আদালতে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতে হয় তাহলে তাদের অনলাইনে সম্পাদন করতে হবে। সরকারি অফিস সময়ের মধ্যে যারা প্রয়োজন মনে করবে তারাই শুধু অফিস খোলা রাখবে।
৩. গণপরিবহন চলাচল সীমিত থাকবে। জনসাধারণকে যথাসম্ভব গণপরিবহন পরিহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যারা জরুরি প্রয়োজনে গণপরিবহন ব্যবহার করবে তাদের অবশ্যই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেই গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। গাড়িচালক ও সহকারীদের অবশ্যই গ্লাভস এবং মাস্ক পরাসহ পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় ছুটিকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রাখার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।
৫. ২৪ মার্চ থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে সশস্ত্র বাহিনী জেলা প্রশাসনকে সহায়তায় নিয়োজিত থাকবে। দেশের ৬৪ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাদের স্ব স্ব জেলার প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর জেলা কমান্ডারকে রিকুইজিশন দেবে।
৬. করোনাভাইরাসের কারণে নিম্নের কোনো ব্যক্তি যদি স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম হয় তাহলে সরকারের যে ঘরে ফেরার কর্মসূচি রয়েছে, সে কর্মসূচির মাধ্যমে তারা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে আয় বৃদ্ধির সুযোগ পাবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন।
৭. ভাসানচরে এক লাখ লোকের আবাসন ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। এ সময় যদি দরিদ্র কোনো ব্যক্তি ভাসানচরে যেতে চান তাহলে তারা যেতে পারবেন। জেলা প্রশাসকদেরকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
৮. করোনাভাইরাসজনিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় অন্নসংস্থানের অসুবিধা নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসকদের খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ সহায়তা প্রদান করা হবে।
৯. প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৫০০ জন চিকিৎসকের তালিকা তৈরি ও তাদের প্রস্তুত রাখবে। যাতে করে তাদের করোনা মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রয়োজনে কাজে লাগানো যায়।
১০. সব ধরনের সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাগম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ জ্বর সর্দি কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মসজিদে না যাওয়ার জন্য বারবার নিষেধ করা হয়েছে। তারপরও সম্প্রতি মিরপুরে একজন বৃদ্ধ অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে যান। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ওই ব্যক্তি পরে মৃত্যুবরণ করেন। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের প্রতি অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে নামাজ আদায় করতে না যাওয়ার অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। 


স্বাস্থ্যসেবাঃ
করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) শনাক্তের পরীক্ষা সহজ ও দ্রুত করতে পরীক্ষা কেন্দ্র বৃদ্ধির কাজ করছে সরকার। বর্তমানে যেসকল স্থানে করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা করা হচ্ছে সেগুলো হলো আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট), আইসিডিডিআর’বি (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অফ প্যাথলজি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বিআইটিআইডি (ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজ, চট্টগ্রাম) ,রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ এবং ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ। আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিতে ঢাকায় ১০ হাজার ৫০টিসহ সারা দেশে ১৪ হাজার ৫৬৫টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের কাফন, জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করার জন্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৬ সদস্যের একটি টিম গঠন করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
রাজধানী ঢাকাতে অনেকগুলো হাসপাতালে হচ্ছে করোনার চিকিৎসা, এগুলো হলো উত্তরার কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারী হাসপাতাল (যোগাযোগঃ 01999-95629), কমলাপুরের বাংলাদেশ রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল (যোগাযোগঃ +8802-5500742), নয়াবাজার মতিঝিলের মহানগর জেনারেল হাসপাতাল (যোগাযোগঃ 02-57390860; 02-7390066), মিরপুর মেটারনিটি হাসপাতাল (যোগাযোগ- 02-9002012), লালবাগের কামরাঙ্গিরচর ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল (যোগাযোগ- 0172632118), সাভারের আমিনবাজার ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল (যোগাযোগ- 01700000000, 01712290100), কেরানিগঞ্জের জিনজিরা ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, জুরাইনের সাজিদা ফাউন্ডেশন হাসপাতাল (যোগাযোগ- 01777-771625) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ (যোগাযোগ- 01819220180), শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল, লালকুঠি হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরা ও মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতাল এবং মুন্সীগঞ্জের ইউনাইটেড হাসপাতাল।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৫০০ ভেন্টিলেটর আছে। তার সাথে আরো ৭০০ ভেন্টিলেটর বসানোর কাজ চলছে। আমদানি করা হচ্ছে আরো ৩৫০ টি। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে আছে ৭০০ ভেন্টিলেটর। সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন ১০০ আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) শয্যা স্থাপনের কাজ চলছে। সেই সাথে আরও ৩০০ শয্যার সরঞ্জাম আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পাশাপাশি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এ হেল্পলাইন স্থাপন করা হয়েছে । এর নাম্বারগুলো হলো 16263 (Hotline), 333, 10655, 01944333222, 01401184551, 01401184554, 01401184555, 01401184556, 01401184559, 01401184560, 01401184563, 01401184568, 01927711784, 01927711785, 01937000011, 01937110011। এখন পর্যন্ত এখান থেকে সেবা নিয়েছেন ১১ লক্ষ ৫ হাজার ৩৫১ জন। হটলাইন সিস্টেমে চিকিৎসাসেবা ও তথ্য প্রদানে যুক্ত আছেন ১ হাজার ৫৪১ জন চিকিৎসা সেবা কর্মী। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গায় পাওয়ার সুবিধার্থে একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে যার ঠিকানা www.corona.  gov.bd।
করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে সারা দেশে ৬২০০টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করেছে সরকার। সারা দেশে ৩২৩টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস সনাক্ত করতে ইতিমধ্যে ৯২ হাজার টেস্টিং কিট সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ হাজার কিট বিতরন করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষন দেওয়া হয়েছে ৭৩০ জন চিকিৎসক, ৪৩জন নার্স এবং ১৯০টি প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের। এছাড়া কোভিড ১৯ বিষয়ক অনলাইন প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করেছেন ১০ হাজার ৮১২ জন চিকিৎসক। ডাক্তারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সারা দেশে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ১৪০টি পিপিই বিতরণ করেছে সরকার। এখনও মজুদ রয়েছে ৪২ হাজার ৮৭০টি পিপিই। সংগ্রহ করা হচ্ছে আরও ১০ লাখ।
পাশাপাশি, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের জন্য অ্যালকোহল, করোনা টেস্ট কিট, টেস্ট ইনস্ট্রুমেন্ট, জীবানুনাশক, মাস্ক, প্রটেকটিভ গিয়ারসহ মোট ১৭ ধরনের পণ্য আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির ঘোষণা দিয়েছে রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দু’টি শর্ত থাকছে তা হলো- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে হবে এবং আমদানি করা পণ্য মানসম্মত কি না তা অধিদপ্তর কর্তৃক নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়াও, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে জনগণের সার্বিক অবস্থা জানতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গ্রাহকদের কাছ থেকে স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য পেতে সব মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর কাছে এসএমএস পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসএমএসের মাধ্যমে মোবাইল ফোনের গ্রাহকের শ্বাস কষ্ট, জ্বর বা কাশি থাকলে *৩৩৩২# নম্বরে ডায়াল করতে বলা হচ্ছে । কোনো গ্রাহক *৩৩৩২# নম্বরে কল করলে ৯০ সেকেন্ডের একটি আইভিআর ভয়েস পাবে যেখানে আবার তাকে পাঁচটি প্রশ্ন করা হচ্ছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া প্রশ্নের উত্তরগুলো সরাসরি চলে যাচ্ছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বা আইইডিসিআরের কাছে। পরে সেগুলো পর্যালোচনা করে কিছু গ্রাহকের কাছে আরো বিস্তারিত তথ্য জানাতে তাকে আইইডিসিআর থেকে ফোন করা হবে।
দরিদ্রদের সুরক্ষাঃ
করোনার প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে খেটে খাওয়া, হতদরিদ্র ও ভাসমান মানুষেরা। এদের কথা মাথায় রেখে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে।
সারাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষদের ১০ টাকা কেজি দরে ৯০ হাজার টন চাল দেওয়া হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোকাবেলায় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ছয় মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সারা দেশে অতিরিক্ত সাড়ে ৬ কোটি টাকা ও ১৩ হাজার টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। এসব চাল ও টাকা ত্রাণ হিসেবে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় ১২ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা এবং প্রায় ৪৬ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা দিয়েছে।
সিলেটে দরিদ্র, দিনমজুরদের সহায়তায় সরকার নগদ ১০ লাখ টাকা এবং ৩২১ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। রাজশাহী সিটি মেয়র নিম্ন আয়ের ২০ হাজার পরিবারকে চাল ও ডাল দিচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন ১০ হাজার হতদরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ২১৫ জন দিনমজুর ও কাঠুরেকে ১০ দিনের খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। রাজবাড়ীর সংসদ সদস্য দৌলতদিয়া যৌনপল্লির ১৩০০ সদস্যের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে। পিরোজপুর সদরের স্থানীয় সংসদ সদস্য ১০০০ কর্মহীন মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন । বরগুনায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য। নওগাঁ সদর উপজেলায় গতকাল ১০ হাজার দরিদ্র পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য দুই হাজার শ্রমজীবী মানুষের বাড়িতে সাত দিনের খাবার পৌঁছে দেন। কেরানীগঞ্জে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের প্রতিদিনের খাবারের ব্যবস্থা করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৫০০ পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়। গাজীপুর-৩ আসনে ১৫ হাজার পরিবারের ঘরে ঘরে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাদারীপুর জেলার ৩ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন যশোরের মনিরামপুরে কর্মহীন ২০০ পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান। কর্মহীন ৪০ হাজার পরিবারের ঘরে ঘরে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে বরিশাল সিটি করপোরেশন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ৮ হাজার নিম্ন আয়ের পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছে। মাদারীপুরে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে হতদরিদ্র ৭ হাজার পরিবারকে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
করোনার বিস্তার রোধে উদ্যোগঃ
করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি বন্ধ ও সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
১৭ মার্চ থেকে আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে হয়েছে। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। আগামী এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে এই পরীক্ষার পরবর্তী সময়সূচি জানানো হবে। অফিস আদালত আগামি ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহন করেছে সরকার। সংসদ টিভিতে ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ নামক অনুষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক ক্লাস চালু করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই ক্লাস চালু রাখতে পারে এবং পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট না হয়। গত ২৯ মার্চ থেকে এই কার্যক্রম চালু হয়েছে।
২১ মার্চ দিবাগত রাত থেকে সব দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ২৪ মার্চ রাত ১২টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই চার মাসের গ্যাসের বিল আগামী জুনে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর জন্য কোনো বিলম্ব মাশুল দিতে হবে না। ডিপিডিসি’র বিদ্যুতের প্রিপেইড বিল প্রদানের অসুবিধা নিরসনের জন্য এজেন্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে তারা এই সময়ে গ্রাহকদের ঘরে গিয়ে রিচার্জের ব্যবস্থা করেন। এজন্য এজেন্টদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। প্রয়োজনে ডিপিডিসির কলসেন্টারে ১৬১১৬ নম্বরে ফোন দিয়ে সহায়তা চাইতে পারবেন গ্রাহকরা।
২৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সকল বিপনি বিতান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সুপারশপ, ওষুধ, মুদি দোকান, কাঁচাবাজারসহ নিত্যপণ্যের দোকানপাট খোলা থাকবে।
আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন ও গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে। নৌযান চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সারাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল, জটলা তৈরি করা, সভা, বৈঠক, আড্ডা দেওয়া বন্ধ করতে বেসামরিক বাহিনীকে সহায়তা করতে ২৪ মার্চ থেকে সেনাবাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। হোম কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশ না মানলে শাস্তির বিধান করেছে সরকার। নির্দেশ অমান্য করে দোকান খোলা রাখলেও আর্থিক জরিমানা করা হচ্ছে।
গুজব মোকাবেলা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণঃ
করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে ইতোমধ্যে ২০টি ফেসবুক আইডি, পেজ বন্ধ করেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত আরও ৫০টি ফেসবুক আইডি, পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল শনাক্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২০ জনকে।
সাধারণ মানুষের জন্য কম দামে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। রাজধানীতে ৫০ টি স্থানে এবং সারাদেশে ৩০০ টি স্থানে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য যাতে কোন ব্যবসায়ী বাড়াতে না পারে সেজন্য আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এমনকি কোন অনলাইন শপ ও অস্বাভাবিক মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও সুরক্ষা পণ্য ,যেমন- মাস্ক, ইত্যাদি বিক্রি করে তাহলে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার।
এই সংকটাপন্ন সময়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধিতে তৎপর থাকে। এদের প্রতিহত করতে মাঠে কাজ করছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 
Advertisment:



করোনা ভাইরাস (Covid-19)

করোনা ভাইরাস: উৎপত্তি, প্রতিকার ও সতর্কতা
চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ফলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২১৩(চলমান) জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার প্রায়। ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই ভাইরাসটি কতটা ভয়ংকর এবং কীভাবে ছড়ায়, তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

করোনা ভাইরাস কী?
করোনা ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি। এটি এক ধরনের করোনা ভাইরাস। ভাইরাসটির অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি হয়তো মানুষের দেহকোষের ভেতরে ইতোমধ্যে ‘মিউটেট করছে’, অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করছে। ফলে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সোমবারই বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, এ ভাইরাস একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে ছড়াতে পারে।
কতটা ভয়ংকর এই ভাইরাস
এই ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। সাধারণ ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার মতো করেই এ ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। তবে এর পরিণামে অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া, নিউমোনিয়া এবং মৃত্যু ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের দুই শতাংশ মারা গেছেন, হয়তো আরও মৃত্যু হতে পারে। তাছাড়া এমন মৃত্যুও হয়ে থাকতে পারে যা চিহ্নিত হয়নি। তাই এ ভাইরাস ঠিক কতটা ভয়ংকর, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এক দশক আগে সার্স (পুরো নাম সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল সেটিও ছিল এক ধরনের করোনা ভাইরাস। এতে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি মানুষ। আর একটি ভাইরাসজনিত রোগ ছিল মিডল ইস্টার্ন রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্স। ২০১২ সালে এতে মৃত্যু হয় ৮৫৮ জনের।

করোনা ভাইরাসের লক্ষ্মণ কী
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর এবং কাশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং তখনই কোনও কোনও রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
কীভাবে ছড়িয়েছে এই ভাইরাস
মধ্য চীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।
তবে ঠিক কীভাবে এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেরনি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সম্ভবত কোনও প্রাণী এর উৎস ছিল। প্রাণী থেকেই প্রথমে ভাইরাসটি কোনও মানুষের দেহে ঢুকেছে এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। এর আগে সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রথমে বাদুড় এবং পরে গন্ধগোকুল থেকে মানুষের দেহে ঢোকার নজির রয়েছে। আর মার্স ভাইরাস ছড়িয়েছিল উট থেকে।
করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে উহান শহরে সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা বলা হচ্ছে। শহরটির একটি বাজারে গিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই বাজারটিতে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হতো
কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনা ভাইরাস বহন করতে পারে। তবে উহানের ওই বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ এবং সাপ বিক্রি হতো।
এর চিকিৎসা কী?
ভাইরাসটি নতুন হওয়াতে এখনই এর কোনও টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এমনকি এমন কোনও চিকিৎসাও নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে মানুষকে নিয়মিত হাত ভালোভাবে ধোয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং ঠান্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। এশিয়ার বহু অংশের মানুষ সার্জিক্যাল মুখোশ পরা শুরু করেছে।
আপাতত প্রতিকার হিসেবে এ ভাইরাস বহনকারীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলছেন বিজ্ঞানীরা। ডাক্তারদের পরামর্শ, বারবার হাত ধোয়া, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা ও ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরা।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এ নির্দেশনায় বলছেন, হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বারবার হাত ধুতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে মুখোশ পরুন, আর নিজে অসুস্থ না হলেও, অন্যের সংস্পর্শ এড়াতে মুখোশ পরুন।
Advertisment:



করোনায় যে অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে হবে বাংলাদেশকে

করোনার সংক্রমণ বিস্তারের আগেই বিশ্বব্যাপী একটি অর্থনৈতিক মন্দার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।
প্রতিবেশী ভারতও মন্দার মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশে অর্থবছরের অর্ধেকে এসে রপ্তানি ও রাজস্ব আয় কমছিল, শিল্পের যন্ত্র ও কাঁচামাল আমদানি এবং অভ্যন্তরীণ পণ্যবাজার সংকুচিত হচ্ছিল। এসব সূচক ছিল একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা শুরুর আভাস।

 দুঃখজনকভাবে সত্য হচ্ছে, করোনাভাইরাস এসে বাংলাদেশের দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তিক্ত করে তুলছে। কোভিড-১৯ তাৎক্ষণিকভাবে ঠিক কী কী সংকট তৈরি করে ফেলেছে এবং সরকার সংকট মোকাবিলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কীভাবে করবে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ! সার্বিকভাবে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে কী কী সম্ভাব্য সংকট তৈরি হবে এবং তার সাপেক্ষে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে সরকার পরিচালনার ওপর তার প্রভাব উপলব্ধিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আমরা অন্তত তিন ধরনের সংকট দেখতে পাচ্ছি:
ক. সমাজের সংকট,
খ. ব্যবসা, সেবা খাত ও উৎপাদনের সংকট এবং
গ. সরকারের ব্যয় নির্বাহের সংকট।
সমাজের সংকট
প্রথমেই শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার সংকট।
 এতে সরকারকে জরুরি স্বাস্থ্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অন্যথায় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার সংকট প্রলম্বিত হয়ে অনুৎপাদনশীলতার জন্ম হবে, যার আর্থিক দায় ব্যাপক। দ্বিতীয় সংকট হতে পারে খাদ্য ও মানবিক সংকট। যেহেতু সংক্রমণ বিস্তার রোধে প্রায় পূর্ণাঙ্গ ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে, তাই নিম্ন আয়ের মানুষ অর্থ ও সঞ্চয় সংকটে পড়বে। শুরুতেই সঞ্চয়হীন ভাসমান মানুষ, দিনমজুর, বৃদ্ধ-অনাথ-এতিম, রিকশা, ছোট কারখানা, নির্মাণশ্রমিক যাঁরা ‘দিন আনে দিন খান’, তাঁরা লকডাউনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই আয় হীনতার কারণে খাদ্যের সংকটে পড়বেন।
শহরের ভাসমান প্রান্তিক অর্থনৈতিক শ্রেণি সামাজিক উৎস থেকে ধার-ঋণ নিতে অক্ষম বলে তাদের জন্য খাদ্যসংকট অবধারিত। গ্রামে ‘সমাজের’ উপস্থিতি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পভিত্তিক ‘উৎপাদনব্যবস্থা’ রয়েছে বিধায় সেখানে খাদ্যসংকট কিছুটা দেরিতে আসবে। গ্রামে ভাসমানদের কর্মহীনতার তৃতীয় কিংবা চতুর্থ সপ্তাহ থেকে খাদ্যসংকট শুরু হতে পারে, তার আগে পর্যন্ত তাঁরা চেয়েচিন্তে চলতে পারবেন হয়তো।
পরেই আসবে কর্মহীন নিম্নবিত্ত, যাদের কিছুটা সঞ্চয় ছিল—এমন শ্রেণি। তার পরে আসবে বেতন বন্ধ হয়ে সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়া নিম্ন–মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্তও। এই সব কটি প্রান্তিক ধারার জন্য জরুরি খাদ্য সরবরাহ করার একটা দায় আছে সরকারের। ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সাত কোটি মানুষের ছয় মাসের জরুরি খাদ্য সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে কেরালার সরকার কুড়ি হাজার কোটি রুপির করোনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, এসেছে বিদ্যুৎ বিলে ছাড়ের ঘোষণা। বাংলাদেশেও মাথাপিছু ন্যূনতম ‘ক্যালরি ধারণ’ ভিত্তিতে ভাসমান প্রান্তিক শ্রেণি, স্থায়ী বেকার, তাৎক্ষণিকভাবে কাজহীন, বেতন বন্ধ হয়ে পড়া, সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়া শ্রেণির জন্য খাদ্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। আর্থিক সংখ্যায় রূপান্তর করলে দেখা যায়, সরকারের জন্য তৈরি হয়েছে বড় এক আর্থিক বোঝা!
আমাদের মোট শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৮ লাখ, যার মাত্র ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রাক্কলন করেছে অন্তত নয় লাখ লোক আনুষ্ঠানিক খাতে কাজহীন হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মে নিয়োজিত শ্রমশক্তির ৮৫ দশমিক ১ শতাংশ বা ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার। শ্রম অধিকার প্রায় বঞ্চিত বিশাল শ্রমশক্তির অধিকাংশই কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
কোভিড-১৯–এর আতঙ্কে বন্ধ হয়ে গেছে ৮৭ দশমিক শিল্পকারখানা।
দেশের ছয়টি শিল্প–অধ্যুষিত এলাকার সব খাত মিলিয়ে শিল্পকারখানা আছে ৭ হাজার ৪০৮টি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, এর মধ্যে ৬ হাজার ৪২৩টি বা ৮৭ শতাংশ শিল্পকারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। দারিদ্র্য ও অতি দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে সাড়ে ২০ ও সাড়ে ১০ শতাংশ (চার কোটি)। তাই পারিবারিক আয়হীন স্থায়ী বেকার, অনানুষ্ঠানিক খাতের অর্ধেক মিলে অন্তত সাড়ে ৬ কোটি মানুষের জন্য এপ্রিলের প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সপ্তাহ থেকেই খাদ্য সরবরাহ লাগতে পারে। তিন মাস জরুরি খাদ্য সরবরাহ করতে লাগে অন্তত কুড়ি হাজার কোটি টাকা। সরকার এই মানবিক দায়িত্ব অস্বীকার করলে অপরাধের বিস্তার ঘটবে, নাগরিক অসন্তোষে দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়ে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সংকট তৈরি করবে। আর এটা দীর্ঘ মেয়াদে কুড়ি হাজার কোটির চেয়েও বেশি ক্ষতির কারণ হবে। ইতিহাসে তেলের মূল্যহ্রাসের সর্ববৃহৎ পতনে (ব্যারেলপ্রতি মাত্র ২০ ডলার) বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলে ছাড় দিয়ে মানুষের সঞ্চয়কাল কিছুটা প্রলম্বিত করা যায়। এভাবে বাসাভাড়ায় সাময়িক ছাড় দিলেও সঞ্চয় দীর্ঘায়িত হবে, এতে ক্ষুদ্রশিল্পেরও উপকার হবে, বাড়িওয়ালাদের প্রণোদনাও দিতে হতে পারে।
এই বিশাল খাদ্য সরবরাহ শুধুই ১০ টাকা চালের সীমিত প্রণোদনায় অসম্ভব। তা ছাড়া ক্যালরির দিক থেকে চাল-ডাল-গম-লবণ-ভোজ্য তেল ইত্যাদিতে জরুরি খাদ্য সরবরাহ বিস্তৃত করতে হবে। করোনার পরেই ‘ঘরে ফেরা’ কর্মসূচি শেষে অলস শ্রমের যে ঘনীভবন হবে, তার শ্রমবাজার গন্তব্য নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে।
ব্যবসা, সেবা খাত ও উৎপাদন সংকট
৬ মার্চ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ২৫ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার বেশি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ক্ষতি হতে পারে। অন্তত প্রতিবেদন অনুযায়ী করোনা পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হলে মোটাদাগে পাঁচটি খাতে করোনার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ব্যবসা-বাণিজ্য-সেবা খাতে, যা ৯ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এ ছাড়া কৃষি খাতে ৫ হাজার ৩৫৫, পর্যটন হোটেল রেস্তোরাঁ ও এ-সংক্রান্ত সেবা খাতে প্রায় ৪ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং পরিবহন খাতে ২ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা সম্ভাব্য ক্ষতি হবে।
করোনা মহামারির প্রথম দিককার তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি বিধায় প্রতিবেদনটি বেশ রক্ষণশীল—কমিয়ে বলা। বাস্তবে ক্ষতির মাত্রা এর চেয়েও ভয়ংকর। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত তৈরি পোশাকশিল্পের ৯৩৬টি কারখানার ৮০০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন পোশাক পণ্যের অর্ডার বাতিল ও স্থগিত হয়েছে, যার মূল্য ২ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা)। এসব কারখানায় প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক রয়েছেন। বিশ্বমন্দা এবং তৈরি পোশাকের প্রতিযোগী দেশগুলোর করোনার নিয়ন্ত্রণ সাফল্যের ওপর নির্ভর করবে ওই সব অর্ডার কতটা ফিরে আসবে কিংবা আদৌ ফিরে আসবে কি না। ইতিমধ্যেই অধিকাংশ পোশাকশিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। চীনে কাঁকড়া, কুঁচে ইত্যাদি রপ্তানি বন্ধ হয়েছে, যার ক্ষতি ৪০০ কোটি টাকার মতো। চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য রপ্তানিতে নতুন ধস এসেছে, ইটিপি সংকটে এই খাতে আগেই ধস ছিল, যদিও এই খাতের ফ্যাক্টরি তৈরির খরচ বেশি। সংকুচিত হয়েছে ওষুধশিল্প, পাট সুতা হোম টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস, সামুদ্রিক মাছ, প্রসাধনীশিল্পও। পোলট্রিশিল্পে বিপর্যয় এসেছে, যশোরে হ্যাচারিতেই প্রতিদিন ২ লাখ বাচ্চা মরছে।
চরম বিপাকে সিরাজগঞ্জসহ দেশের দুগ্ধখামারিরা, বিপাকে আছে সবজি ও মৎস্য খাত। সমস্যায় পড়েছে দোকান মালিক, পত্রিকা-ছাপাশিল্প, রড–সিমেন্ট উৎপাদনকারী থেকে এভিয়েশন খাত। এই সবকিছুর ফলে বড় বিপর্যয়ে পড়তে যাচ্ছে বিমা খাত। শপিং কমপ্লেক্স, বিপণিবিতান ও বিলাসপণ্যসহ জরুরি খাদ্য ও ওষুধ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারের ভোগ্যপণ্যের বিকিকিনি একেবারেই বন্ধ, এতে করে ভ্যাট আহরণ বিশাল ধাক্কা খেয়েছে। নির্মাণশিল্প সরকারে দেশজ উৎপাদনের একটা বড় খাত, করোনার প্রভাবে এ শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত। এতে করে মেগা প্রকল্পসহ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দীর্ঘায়িত হবে এবং ব্যয় বাড়বে। রেকর্ড পরিমাণ উচ্চ খরচ, উচ্চমাত্রার দুর্নীতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতাজনিত সমস্যাগুলো দীর্ঘায়িত হয়ে আর্থিক সংকট প্রকটতর করবে।
এদিকে কাঁচামাল আমদানি কমেছে, ডিসেম্বরে থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, তবে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ আগেই কমেছিল। মার্চে আরও কমে ২৬ শতাংশের বেশি নিচে নেমেছে। রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় উৎস চট্টগ্রাম বন্দরে স্বাভাবিকভাবে ৪৫ হাজার টিইউএসের বেশি কনটেইনার (ধারণক্ষমতা ৪৯) পরিমাণ ব্যবহৃত হয়, এটা কমে সম্প্রতি ৩২ থেকে ৩৪ হাজার টিইউএসে নেমে এসেছে। এতে আমদানি শুল্ক কমে গেছে।
অর্থনীতির সবচেয়ে সুবিধাজনক খাত ছিল রেমিট্যান্স। সেখানেও মন্দা ভাব দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারিতে ৫ কোটি ডলার কমেছে, ফেব্রুয়ারিতে ১৯ কোটি ডলার প্রবাসী আয় কমে গেছে। এটা মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে অব্যাহত থাকবে, কেননা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স উৎস দেশ মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ এবং আমেরিকায় কোভিড-১৯–এর বিস্তার ব্যাপকতর। যেহেতু ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা (৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা) দেওয়া আছে, তাই হয়তো এখানে নতুন প্রণোদনা সম্ভব নাও হতে পারে। পাশাপাশি সংকটে পড়েছেন দেশের বিশালসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার এবং আমাদের সফটওয়্যার খাত।
সরকারের ব্যয় নির্বাহের সংকট
ট্রেজারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র সুদ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ প্রদান বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয়ের খাত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাজনিত বৈশ্বিক মন্দার চাপ, চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহের চাপ। এতে করে ভ্যাট, আয়কর, আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক, ব্যাংকিং শুল্ক সবকিছুই কমে যাবে। রেমিট্যান্স কমলেও আমদানি কমেছে বলে রিজার্ভ এখনই সংকটে পড়বে না। যেহেতু অনুন্নত বাজেটে সরকার পরিচালনার ব্যয়, বেতন ভাতা, সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদিতে কাটছাঁটের সুযোগ নেই, তাই উন্নয়ন বা এডিবি প্রকল্প সংকোচন করতে হবে। এতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থেকেও আয় কমে যাবে।
আবার ব্যবসা, সেবা খাত ও উৎপাদন সংকট মেটাতে আনুষ্ঠানিক এবং অন্তত কর্মসংস্থান ঠিক রাখতে অনানুষ্ঠানিক খাত মিলিয়ে সব কটি খাতকে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে। পাশাপাশি শুধু তাৎক্ষণিকভাবে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার মানবিক খাদ্য, চিকিৎসা ও শিল্প বরাদ্দ তৈরি করতে হবে। কথা হচ্ছে, এত অর্থ আসবে কোত্থেকে?
সরকার সারা বছরের প্রাক্কলিত ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেলছে। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। অনুমান হচ্ছে, মোট রাজস্ব ঘাটতি ১ বা সোয়া ১ লাখ কোটি হয়ে যাবে। প্রাথমিক বাজেটেই ঘাটতি ছিল প্রায় দেড় লাখ কোটি, বৈদেশিক ঋণ আসেনি প্রত্যাশামতো। এদিকে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে সুদ ব্যবস্থা অর্থাৎ মানি সাপ্লাই ও নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। তৈরি হয়েছে করোনাসংক্রান্ত আরও প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার নতুন চাপ।
ফলে সোয়া পাঁচ লাখ কোটির বাজেট অঙ্কের হিসাবেই অর্ধেকের কাছাকাছি কমে যাচ্ছে, দুর্নীতি ও বাস্তবায়ন অদক্ষতায় যার ‘ভ্যালু’ আরও অনেক কম। সব মিলিয়ে এডিপি কাটছাঁট করে প্রণোদনার সংস্থান করতে হবে। তবে এডিপি কাটছাঁটে গেলে জবাবদিহিহীনতা দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক পকেটগুলো সরকার তৈরি করেছে, সেগুলোও খেপে উঠবে। সব মিলিয়ে দুঃখজনকভাবে সরকার একটা ভয়াবহ আর্থিক ও পরিচালনা সংকটে পড়ে যাচ্ছে।
এমতাবস্থায় সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রভাবশালীদের বিশেষ প্রণোদনা না দিয়ে সমন্বিত ‘মন্দা পরিকল্পনা’ তৈরি করতে হবে। সরকারের রাজস্ব, ব্যয় নির্বাহ, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ কী হবে, তার প্রাক্কলন করা খুবই জরুরি। অর্থাৎ কোভিড-১৯ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার একটা সমন্বিত এবং পরস্পর সম্পর্কিত বোধগম্য রূপরেখা প্রণয়ন তৈরি এখনই শুরু হওয়া উচিত। অন্যথায় করোনার হাত ধরে আসা সংকট এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলবে।
Advertisment:


নভেল করোনাভাইরাসের ভূ-রাজনীতি

তারেক শামসুর রেহমান
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০
যুগান্তর

 
ভাইরাসটির নাম এখন COVID-19, যা করোনাভাইরাস নামেই পরিচিতি পেয়েছে। এ করোনাভাইরাস এখন একটি আতঙ্কের নাম। চীনের উহান শহরে যার প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং দ্রুত চীনের আরও কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে চীনের পার্শ্ববর্তী হংকং, তাইওয়ানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। গেল সপ্তাহের খবর- চীনের পর সিঙ্গাপুরে সবচেয়ে বেশি লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।
চীন এখন কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। এ ভাইরাসে প্রতিদিনই মৃতের সংখ্যা বাড়ছে এবং ধারণা করছি এ সংখ্যা কয়েক হাজারে উন্নীত হবে আগামী কিছুদিনের মধ্যে। এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুধু যে চীনের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে তা নয়, বরং বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও বড় আঘাত হানবে, যা হয়তো আমরা দেখতে পাব আগামী ৫-৬ মাস পর।
চীনে এ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন, নানা জিজ্ঞাসা। হঠাৎ করেই কি এ ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটল? আর চীনেই বা কেন ঘটল? কেন ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে এ মহামারীটি ছড়িয়ে পড়ল না? যারা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করেন, তারা চীনে এ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একটা ‘ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন। বিবিসির একটি প্রতিবেদনেও (৮ ফেব্রুয়ারি) পরোক্ষভাবে এ ‘ষড়যন্ত্রের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে রাশিয়ার টিভি চ্যানেল ওয়ানের একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এ ভাইরাসটি কৃত্রিমভাবে ল্যাবরেটরিতে উৎপাদন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার এক ল্যাবে এটি তৈরি করা হয়। ভাইরাসটি একটি জৈব মারণাস্ত্র। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়া। আর পরীক্ষাগারে এমনভাবে এ ভাইরাসটি তৈরি করা হয়েছে, যাতে শুধু এশিয়ার মানুষদেরই তা আক্রান্ত করতে পারে।
এ ভাইরাসটিকে বলা হচ্ছে ‘জাতিগত বায়ো উইপন’। উহানে যারা মারা গেছে, তারা সবাই চৈনিক। তবে সেখানে একজন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর খবরও ছাপা হয়েছে। এখন ওই মার্কিন নাগরিকের মাধ্যমেই কি এ ভাইরাসটি ছড়াল? যদিও বলা হচ্ছে, ৩১ ডিসেম্বর (২০১৯) চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের একটি সামুদ্রিক বাজারে প্রথম করোনাভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। আবার বলা হচ্ছে, বাদুড়জাতীয় প্রাণী থেকে এ ভাইরাসের উৎপত্তি। এর পেছনে আদৌ কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ আছে কিনা, কিংবা বাইরের ‘শক্তি’র কোনো ইন্ধন আছে কিনা, তা চীনা সংবাদপত্রে এখনও প্রকাশিত হয়নি। কিংবা চীনের পক্ষ থেকেও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি।
তবে এটি তো বলতেই হবে, চীন একটি বড় শক্তি। ভাইরাস চিহ্নিত করার ব্যর্থতা কিংবা তথাকথিত ‘ষড়যন্ত্র’ রোধ করার ব্যর্থতা বিশ্বে চীনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে হ্রাস করবে। হয়তো চীন এটি বিবেচনায় নেবে! কতগুলো বিষয় এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। এক. চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ এবং শেষ মুহূর্তে এ বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই চীনের উহানে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটল। চীনের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আরও বেশি নির্ভরশীল করতে চীনকে বাধ্য করার উদ্দেশ্যেই এ ভাইরাস তথা জৈব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে- ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের’ সমর্থকরা এভাবে এর ব্যাখ্যা করতে পারেন।
দুই. উহান কেন? উহানকে (হুবাই প্রদেশের রাজধানী) বলা হয় ‘শিকাগো অব দি ইস্ট’। শিল্প তথা গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে উহান। ‘হাই-টেক’ শিল্পের যন্ত্রাংশও জোগান দেয় উহান। Tsinghua Unigroup (একটি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি), BOE Technology Group-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানির কারখানা উহানে অবস্থিত। স্মার্টফোন Xiaomi'র নিজস্ব Artificial Intelligence Development সেন্টার রয়েছে উহানে। চীনের অটো শিল্পের সদর দফতরও এই উহানে।
অত্যাধুনিক সব বাস ও যানবাহন এখানে তৈরি হয়। টেসলার (ইলেকট্রিক কার) যন্ত্রাংশ এখানে তৈরি হয়। নিক্কি এশিয়ান রিভিউয়ের মতে, হুবাই প্রদেশে যেসব কারখানা আছে, সেখানে ২০১৮ সালে ২.৪২ মিলিয়ন অর্থাৎ ২৪ লাখ ২ হাজার গাড়ি তৈরি হয়েছে, যা কিনা ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও থ্যাইল্যান্ডে যে সংখ্যক গাড়ি তৈরি হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি। জেনারেল মোটরস, হোন্ডা, ফ্রান্সের পিএসএ গ্রুপ (যারা সবাই গাড়ি উৎপাদন করে), তাদের উহানে যৌথ কারখানা আছে।
শুধু উহানেই মোটরগাড়ির ৫০০ খুচরা যন্ত্রাংশ কারখানা আছে। এমনকি Pfizer, JHL Biotech, Fresenius- এসব বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির কারখানা রয়েছে উহানে।
চীনের অর্থনীতির ৪ শতাংশ জোগান দেয় এ উহান শহর (নিক্কি এশিয়ান রিভিউ, ৪ ফেব্রুয়ারি)। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘Made in China 2025’-এর যে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন, তাতে উহানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু এখন সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে গেল। সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তা বিশ্ববাজারেও একটি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইলেকট্রিক কার টেসলা যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এ গাড়ির জন্য মানুষ সেখানে বেশি করে ঝুঁকছে। সরকার এ গাড়ির জন্য কর মওকুফ করেছে।
এই টেসলা গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন হয় উহানে। উহানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে টেসলার যন্ত্রাংশ এখন সরবরাহ করা যাবে না। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হবে। এতে করে সুবিধা পাবে অন্যান্য গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। Apple-এর আইফোন সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত আছি। এই আইফোন তৈরি হয় উহানে।
চীনে আইফোন উৎপাদিত হলেও তা চীনে বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। স্টারবাক্স কফি সম্পর্কে আমরা নিশ্চয়ই অবগত। এ স্টারবাক্স কফির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রের পর চীনে। এ ব্যবসায়ও এখন বড় ধরনের ধস নেমেছে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথাটা এজন্যই এসেছে যে, চীনের অর্থনীতিকে একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিলে কারা লাভবান হবে? করোনাভাইরাসের কারণে চীনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। চীনের রফতানি খাতে এখন শ্লথগতি আসবে। চীন তার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এক কাতারে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছিল।
এটি একটি বিরাট কর্মযজ্ঞ। এর মাধ্যমে বিশ্বে চীনের গ্রহণযোগ্যতা একদিকে যেমনি বৃদ্ধি পাবে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে হ্রাস পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব করার প্রবণতা। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সমর্থকরা এর সঙ্গে চীনের বর্তমান পরিস্থিতিকে মেলাতে পারেন। এবং এক ধরনের ‘ষড়যন্ত্র’ আবিষ্কার করতে পারেন।
নিঃসন্দেহে চীন এ মুহূর্তে একটি বিশ্বশক্তি। চীন বিশ্বে যে পরিবর্তন ডেকে এনেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব অনেক অংশেই খর্ব হয়েছে। আমরা কিছু তথ্য দিয়ে বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করব।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, যা মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্টদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে (পাঠক, সদ্য প্রকাশিত আমার বই ‘চীন বিপ্লবের ৭০ বছর’ পড়ে দেখতে পারেন)। এটি সত্য, এ মুহূর্তে জিডিপিতে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছুটা পিছিয়ে আছে। সাধারণ নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি যেখানে ১৯.৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে চীনের জিডিপি ১২.২৪ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্বে চীনের অবস্থান দ্বিতীয় (কিন্তু ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে জিডিপি-পিপিপিতে চীনের অবস্থান শীর্ষে, ২৯.৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দ্বিতীয়, ২২.২ ট্রিলিয়ন ডলার)। অর্থনীতিবিদরা যে প্রাক্কলন করেছেন, তাতে সাধারণ নিয়মে জিডিপিতে ২০৫০ সালে চীন শীর্ষে অবস্থান করবে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হবে দ্বিতীয়। ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বজায় থাকবে (২৪.৮ ট্রিলিয়ন ডলার, চীনের ২২.১ ট্রিলিয়ন ডলার)। কিন্তু ২০৫০ সালে এ দৃশ্যপট বদলে যাবে।
৫৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার (পিপিপি) নিয়ে চীন থাকবে শীর্ষে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হবে তিন নম্বরে, ৩৪.১ ট্রিলিয়ন ডলার (ভারত ২ নম্বরে, ৪৪.১ ট্রিলিয়ন ডলার)। সুতরাং চীনের অর্থনীতি যে পশ্চিমাদের কাছে টার্গেট হবে, তা বলাই বাহুল্য। চীনের ‘রেয়ার আর্থ’ নামে দুটি বিরল মৃত্তিকা উপাদান রয়েছে, যা বিশ্বের কোনো দেশের নেই। এ দুটি উপাদানের নাম হচ্ছে হালকা বিরল মৃত্তিকা উপাদান বা এলআরইই এবং ভারী বিরল মৃত্তিকা উপাদান বা এইচআরইই। ইট্রিয়াম ও স্ক্যান্ডিয়ামের একত্রিতভাবে বিরল মৃত্তিকা উপাদান হিসেবে পরিচিত। এগুলো খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাত এবং উদীয়মান ও সম্ভাব্য প্রযুক্তির কাছে এর তাৎপর্য অনেক।
বাজারের বেশির ভাগ অংশের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ দুর্লভ মৃত্তিকা উপাদানগুলোকে ভূ-রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা দিয়েছে। যেভাবেই হোক যুক্তরাষ্ট্র এ বিরল মৃত্তিকার ওপর চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমাতে চাইবে। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি এ কারণেই প্রাসঙ্গিক।
সিরিয়াস পাঠকরা স্মরণ করতে পারেন ১৯৭৮-১৯৮১ সালে কিউবার পরিস্থিতির কথা। ওই সময় ৫ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অভিযোগ করেছিলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘biological attack’। অর্থাৎ জৈব রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র! যদিও ওই অভিযোগের কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। আরেকটি তথ্য দেই- পৃথিবীর ২৫টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের জৈব রাসায়নিক ল্যাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের Military Threat Reduction Agency এসব ল্যাব পরিচালনা ও গবেষণার জন্য ২.১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। মূলত চারটি দেশ বা অঞ্চল (চীন, রাশিয়া, ইরান ও মধ্য আফ্রিকা তথা পশ্চিম আফ্রিকাকে কেন্দ্র করেই এসব জৈব রাসায়নিক ল্যাবে গবেষণা হয় (Covert Geopolitics-এ Julia Papsheva’র প্রবন্ধ)।
ওইসব ল্যাবে কী ধরনের গবেষণা হয়, তা অনেকেই জানে না। যুক্তরাষ্ট্র কখনও তা স্বীকারও করেনি। সুতরাং হঠাৎ করেই চীনে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, এর কারণে এ যাবৎ হাজারের ওপর মানুষের মৃত্যু এবং সেই সঙ্গে চীনের অর্থনীতিতে ধস নেমে আসা- সব মিলিয়ে সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকেই সামনে নিয়ে আসে। আমরা জানি না এর প্রকৃত রহস্য আদৌ কোনোদিন জানতে পারব কিনা।
কিংবা চীন নিজে তা স্বীকার করে বিশ্ববাসীর কাছে তার ‘অযোগ্যতার’ কথা বিশ্ববাসীকে জানান দিতে চাইবে কিনা, তা-ও আমি নিশ্চিত নই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, উহানের করোনাভাইরাসের ‘ঘটনা’ চীনের রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনবে (Global Voices, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। শুধু তাই নয়, এমন মন্তব্যও করা হয়েছে যে, ‘The coronavirus threatens the Chinese Communist Party's grip on power' (South China Morning Post, 9 February 2020)। এ ধরনের মন্তব্য কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। নিঃসন্দেহে এ ধরনের ‘ঘটনা’ চীনের জন্য একটি ‘শিক্ষা’।
তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Advertisment:


বিশ্ব অর্থনীতির যে ক্ষতি করেছে ও করবে করোনাভাইরাস

করোনাভাইরাসের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব, ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি।

এই ভাইরাসের ছোবলে বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ৯১ হাজার ৮১০ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার ১২৭ জনের। বিশ্বব্যাপী প্রতিমুহূর্তে বাড়ছে এই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।

এখন পর্যন্ত মারণ এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়ায় সামাজিকভাবে এটিকে প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। এ জন্য বিশ্বের আক্রান্ত প্রায় সব দেশই লকডাউনের মধ্য দিয়ে চলছে। এতে করে ভয়াবহ ধস নেমেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।

এক নজরে বিশ্ব অর্থনীতির ভয়াবহ ধসের চিত্র তুলে ধরা হল:-
১. করোনায় লকডাউনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র আমেরিকার রপ্তানি বাণিজ্যে চরম ধস নেমেছে। এতে করে মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি ২০০৯ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে।

২. করোনার কারণে গাল্ফ উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিতেও ব্যাপক ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, এ বছর এই দেশগুলোর অর্থনীতি ৭.৬ শতাংশ হারে সংকুচিত হবে।

৩. এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়ার বার্ষিক মূল্যস্ফীতি গত জুনে চরমে পৌঁছেছে, যা গত ২০ বছরে সর্বনিম্ন।

৪. চলতি বছর (২০২০ সাল) ইউরোপের দেশ গ্রিসের অর্থনীতি ৫.৮ শতাংশ হ্রাস পাবে। ব্যাংক অব গ্রিস সম্প্রতি এই তথ্য জানিয়েছে।

৫. করোনার কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতেও ভয়াবহ ধস নেমেছে। চলতি বছরের শুরুতে ব্রিটেনের অর্থনীতির যে পতন দেখা যায়, তা দেশটির ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি।

৬. মহামারির কারণে ভিয়েতনামের জিডিপি রেকর্ড হারে কমেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটির জিডিপি ছিল মাত্র ১.৮১ শতাংশ, যা ২০১১ সালের পর সর্বনিম্ন।

৭. করোনাভাইরাসের প্রকোপ থেকে সামলাতে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিও। দেশটিতে এরই মধ্যে গত ৩০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে দেশটিতে করোনাকালে বেকারত্বের হার বেড়েছে ৭.১ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

৮. আইএমএফ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সম্প্রতি বলেছেন, করোনাভাইরাসের এই সংকটের কারণে বৈশ্বিক জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

৯. আইএমএফ’র মতে, বৈশ্বিক এই সংকটের কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতি ৪.৯ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ




পোশাক খাত কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে ?

মামুন রশীদ
২৮ জুন ২০২০
প্রথম আলো

 
করোনার আগে প্রায় কয়েক দশক ধরে, তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আমাদের প্রীত করেছে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৬ বিলিয়নে এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। আরও আশাব্যঞ্জক বিষয়টি ছিল ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ৫০ বিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ।

তবে ধীরে ধীরে, বিশেষ করে করোনাকালে এসে সরকারের অনেক সাহায্য-সহায়তা সত্ত্বেও তৈরি পোশাক খাত এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই অনুধাবন করছেন যে এত দিন ধরে তাঁরা যে প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি অনুযায়ী তৈরি পোশাক খাতকে পরিচালনা করে আসছিলেন, ভবিষ্যতে তাঁরা একইভাবে তাঁদের কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যেতে পারেন না।

 এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলোকে  তাদের ব্যবসায়িক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নতুন পন্থার উদ্ভাবন ঘটাতে হবে। অন্যান্য দেশের পোশাকশিল্প, যারা এমনকি করোনাকালেও দ্রুততার সঙ্গে তাদের তৈরি পোশাকের রপ্তানি কার্যক্রম বৃদ্ধি করে চলেছে, তাদের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকতে হলে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের অবশ্যই নিজেদের নতুন করে তৈরি করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন হলো দুটি প্রধান শক্তি, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রযুক্তিগত সমাধান বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক
 সুবিধা দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে পোশাকশিল্পও। উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, উৎপাদনের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা, সরবরাহের ক্ষেত্রে বিলম্ব দূর, সামগ্রিক ব্যয় হ্রাস এবং গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টায় নিয়োজিত, যাতে তারা গ্রাহকদের সর্বোচ্চ মানের পণ্য সরবরাহে সক্ষম হয়।

যেকোনো কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে ধারাবাহিকভাবে ক্রেতাদের প্রত্যাশা পূরণের সক্ষমতার ওপর, কেননা এটি বাজারে কোম্পানির পণ্য এবং পরিষেবাগুলোকে ঘিরে বড় ধরনের চাহিদা তৈরি করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত মূলত বড় ধরনের রপ্তানিনির্ভর শিল্প। এর গ্রাহকদের একটি বড় অংশই তৈরি পোশাকের খুচরা বিক্রেতা, যাদের বেশির ভাগই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা এবং অতি সম্প্রতি তৈরি হওয়া বেশ কিছু উদীয়মান বাজারগুলোয় বৃহত্তর রিটেইল চেইনের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করে। এ ক্রেতারা সাধারণত আসন্ন মৌসুমে নির্দিষ্ট ধরনের পোশাকের আগাম ফরমাশ দিয়ে থাকেন, যেখানে তাঁদের পছন্দসই নির্বাচিত কাপড় ব্যবহার করতে হয় এবং যা কিনা পালাক্রমে সুনির্দিষ্ট সুতা দিয়ে তৈরি। যেহেতু এখানে ভ্যালু চেইনের পরিধি বিস্তৃত এবং কাজের বেশির ভাগ প্রক্রিয়াই স্বয়ংক্রিয় নয়, তাই ফরমাশ প্রদান এবং পণ্য সরবরাহের মধ্যকার সময়সীমা বেশি হয়ে থাকে।
ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রেতাদের প্রত্যাশা থাকে যে তারা বছরের শুরুতে প্রতিশ্রুতি অনুসারে চাহিদা মোতাবেক সুনির্দিষ্ট নকশা, আকার ও রঙের পোশাক সরবরাহ করবে। বিলম্বিত চালান (অসম্পূর্ণ বা ভুল চালান) খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে। কারণ, এর মাধ্যমে কোনো একটি উপকরণের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে, যেটি হয়তো ওই মৌসুমে অনেক দ্রুত বিক্রি হয়েছে অথবা একই সময়ে হয়তো বিক্রি না হওয়ার ফলে বিক্রেতাদের হাতে একই ধরনের অনেক কাপড় থেকে যেতে পারে। বিক্রয় ক্ষতি, অ-চলমান মজুত, মূল্যছাড়, জরিমানা এবং সুনামের ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি পোশাকের গ্রাহকদের জন্য যা লোকসানেরই নামান্তর, আর এর জন্য তারা মূলত তাদের সরবরাহকারীদেরই দায়ী করে। এ ধরনের ক্ষতির বিপরীতে সাধারণভাবে যা করতে হয়, তা হলো মৌসুম শেষে ডিসকাউন্ট বা মূল্যছাড়। পোশাক খাতের সাধারণ গ্রাহকের প্রত্যাশা থাকে সঠিক পণ্য, সঠিক মান, সঠিক পরিমাণ এবং সঠিক সময়। তা ছাড়া উৎপাদন খরচ কমাতে ক্রমবর্ধমান চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। তৈরি পোশাক খাতের গ্রাহকদের প্রত্যাশার পরিমাপ করা সহজ, কিন্তু তা পূরণ করা ততটাই কঠিন।

এ খাতের ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বিভিন্ন ধরনের অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হতে হয়, যা কিনা প্রায়ই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্যের চালান পৌঁছানো, গুণগত মান বজায় রাখা এবং পণ্যের বিক্রয় মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীরা বর্তমানে পরীক্ষিত পরিচালন দক্ষতা দর্শন বা টাইম টেস্টেড ফিলোসফিতে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। এই দর্শন বিশ্বজুড়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাসুবিধা প্রদান করেছে। তাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের ধারণাটি প্রয়োগের এখনই উপযুক্ত সময়।

 পরিচালন দক্ষতা মূলত ব্যাপক পরিসরে ব্যবসায়িক উন্নয়ন কাঠামো, যেখানে সেরা সব সরঞ্জাম যেমন, লিন, সিক্স সিগমা, টোটাল প্রোডাকটিভিটি ম্যানেজমেন্ট (টিপিএম), থিওরি অব কনস্ট্রেইন্টস (টিওসি), অ্যাডজাস্ট-ইন-টাইম (এআইটি) ইত্যাদি পদ্ধতিগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লাভজনক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা হয়। ওই সব সরঞ্জাম ও পদ্ধতি কোম্পানিকে তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি, পর্যায়ক্রমিক খরচ হ্রাস, গুণগত মানের উন্নয়ন, প্রতিটি স্তরের ত্রুটি দূরীকরণ, নির্দিষ্ট তারিখে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করে। তা ছাড়া এটি গ্রাহককে সম্পূর্ণভাবে নতুন অভিজ্ঞতা প্রদান করে। প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং উদ্ভাবন সত্যিকার অর্থেই একটি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালন শ্রেষ্ঠত্বের দিকে দ্রুত যাত্রার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

প্রযুক্তিগত রূপান্তর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে গ্রাহক-সন্তুষ্টির উন্নতীকরণের পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। তা ছাড়া এটি সামগ্রিক মান প্রবাহজুড়ে উপকরণ-প্রবাহের পাশাপাশি তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের মাধ্যমে সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দৃশ্যমানতা তৈরি করতে পারে, যা কিনা পোশাক খাতের মতো গ্রাহক-সন্তুষ্টিনির্ভর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি পরিচালন দক্ষতার মধ্যে রয়েছে ভ্যালু স্টিম ম্যাপ (ভিএসএম)।
এটা উৎপাদন-চক্রের সময় কমানো, অপচয় হ্রাস, সামগ্রিক উৎপাদন-প্রক্রিয়ার দৃশ্যমানতা এবং উপকরণ ও তথ্যপ্রবাহ তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার। যখন জটিল কোনো প্রক্রিয়ার জন্য একবার ভিএসএম চালু করা হয়, তখন ব্যাপকভাবে প্রযুক্তিগত সমাধান ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রক্রিয়ার জটিলতাগুলোকে সহজ করা যেতে পারে। এটি মূল্য যোগ করে না—এমন কার্যক্রমগুলোকে পরিহার করে এবং বড় ধরনের অগ্রগতির নেতৃত্ব দেয়।
এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিংয়ের (ইআরপি) মাধ্যমে সুতা থেকে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত একটি মসৃণ উপাদান-প্রবাহ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে; তা ছাড়া এটি প্রতিটি পর্যায়ে উপকরণের বিস্তারিত তালিকা তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, ক্ষতি নিরূপণ করে এবং সঠিক গুণগত মান অনুসারে সঠিক স্টক কিপিং ইউনিটের (এসকেইউ) উৎপাদন নিশ্চিত করে এবং সঠিক গ্রাহকের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য প্রেরণ করে। সংক্ষেপে, প্রযুক্তিগত রূপান্তর প্রতিষ্ঠানগুলোয় তাদের পরিচালন দক্ষতা কর্মসূচিকে সমর্থনের পাশাপাশি গতি সঞ্চারের বিষয়গুলোকে সম্ভব করতে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। বিশ্বজুড়ে পোশাকশিল্পের সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতার উন্নতির লক্ষ্যে প্রযুক্তিসরঞ্জাম এবং কৌশলগুলো বারবার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই বিলম্ব না করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত-সংশ্লিষ্টদেরও এটি অনুসরণ করা উচিত।

প্রযুক্তিগত রূপান্তর কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণকে সমর্থনের মাধ্যমে দক্ষতার উন্নতি ও আরও ভালো তথ্য ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা দান করা এবং কর্মক্ষমতা নিরীক্ষণ করে, তার উদাহরণ আমাদের কাছেই রয়েছে।

বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্প একটি সংকটময় মুহূর্ত বা চ্যালেঞ্জের মুখে উপনীত। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাতটির বিকাশেরও অপরিমেয় সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, অন্যান্য তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের পক্ষ থেকে আমাদের মারাত্মক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ব্যবসায়ের সফলতা ধরে রাখার জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পটভূমি তৈরি অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই তৈরির পোশাক খাতটিকে বর্তমান ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জগুলোকে দ্রুত জয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মাধ্যমে পরিচালনা দক্ষতা বাড়িয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে তারা তাদের ব্যবসায়িক কর্মক্ষমতাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি অর্জন করতে পারে। প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে পোশাক খাত গ্রাহকের প্রত্যাশাকে—সঠিক পণ্য, সঠিক মান, সঠিক পরিমাণ, সঠিক সময়—চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২৫ বিলিয়ন ডলার। জুন পর্যন্ত এর পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না বলে অনেকেই মনে করছেন। সংখ্যাটি গেল বছরের তুলনায় ২০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে এবং প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। ২০২১ অর্থবছরে ভোক্তার চাহিদার রকমফের এবং বিক্রেতার প্রকারভেদে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকলেও পোশাকের ব্যবহার এবং রপ্তানি বাড়বে বলে অনেকে মনে করলেও প্রায় সবাই বলছেন, এই সুযোগ নেবে ভিয়েতনাম ও অন্য কিছু দেশ, বাংলাদেশ নয়। ‘ফরমাল ওয়্যার’ থেকে ‘ক্যাজুয়াল ওয়্যারে’ বা হাইস্ট্রিট রিটেইল শপ থেকে ‘মম অ্যান্ড পপ’ শপে ভোক্তার শিফট হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানি কমেছে ১৫ শতাংশ, ইউরোপে ১০ শতাংশ আর ভিয়েতনামের কমেছে ৫ শতাংশ। আগামী বছরে পোশাক রপ্তানি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। এদের অনেকেই এ ক্ষেত্রে ‘পেনি ওয়াইজ পাউন্ড ফুলিস’ বলে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠা
নের সঙ্গে দুর্বল আইনি চুক্তিকেও দুষছেন। প্রায় সবাই বলছেন, শুধু সরকারি সহায়তায় নয়, পোশাকশিল্পকে উঠে আসতে হবে আপন শক্তিতে। শ্রমিক-সুপারভাইজারসহ সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে নিয়ে, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতায়। উদ্ভাবনী শক্তি আর অভিনবত্বকে সঙ্গী করে।
অনেকেই বলছেন, রপ্তানিই করতে পারছি না, নতুন প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের টাকা পাব কোথায়? ভবিষ্যতের জন্য টাকা বাঁচিয়ে কিংবা আগের সঞ্চয় বা মুনাফা থেকে হলেও নতুন ডিজাইন, প্রোডাকশন লাইন বা শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়নে সঠিক বিনিয়োগের এখনই সময়। এমনকি ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে বিজনেস টু বিজনেসের (বিটুবি) পরিবর্তে সংযোগ স্থাপন করতে হবে বিজনেস টু কনজিউমার (বিটুসি) বা ছোট ছোট ভোক্তাগোষ্ঠীর সঙ্গে। বাংলাদেশের জমিলা আর রহিমার গল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ফেলতে হবে নতুন ও উদীয়মান ভোক্তাদের। জোট বেঁধে কাজ করতে পারলে উন্নয়ন-সহযোগীদেরও সঙ্গে মিলতে পারে।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

Advertisment:

Close

Post a Comment

Use Comment Box ! Write your thinking about this post and share with audience.

Previous Post Next Post

Sponsord

Sponsord